প্রিয় রাজশাহী ডেস্কঃ তানজিদ হাসানের ঝড়ো ব্যাটিং দুর্দান্ত শুরু পেল ঢাকা ক্যাপিটালস। এরপর হুট করেই যেন রান করতে ভুলে গেল তারা। আর কেউই তেমন কিছু করতে না পারায় অল্পেই থেমে গেল ঢাকা। ছোট লক্ষ্যে মেহেদী হাসান মিরাজের ফিফটিতে অনায়াস জয়ে প্লে-অফের টিকেট পেয়ে গেল খুলনা টাইগার্স।
সেরা চারের টিকেট পেতে নিজেদের শেষ দুই ম্যাচে জয়ের বিকল্প ছিল না খুলনার। তাই প্লে-অফ শুরুর আগেই ম্যাচ দুটিকে ‘নকআউট’ ঘোষণা দিয়ে দেন অধিনায়ক মিরাজ। দুই নকআউট জিতেই দুর্বার রাজশাহীর বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিলেন তারা।
মিরপুর শের-ই বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শনিবার খুলনার জয় ৪ উইকেটে। প্রথম পর্বের ১২ ম্যাচে তাদের এটি ষষ্ঠ জয়। সমান ছয়টি জয় রাজশাহীরও। তবে শ্রেয়তর নেট রান রেটে সেরা চারে টিকে রইল খুলনা।
তানজিদের ঝড়ো শুরুর পরও ৯ উইকেটে ১২৩ রানের বেশি করতে পারেনি ঢাকা। ১৯ বল বাকি থাকতেই সেটি টপকে যায় খুলনা।
গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মিরাজ। বল হাতে লিটন কুমার দাসের উইকেটের পর ব্যাটিংয়ে অপরাজিত ৭৪ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। পরে নিজের ছেলেকে নিয়ে গ্রহণ করেন ম্যাচ সেরার পুরস্কার।
তানজিদের ঝড়
প্রথম ওভারেই নাসুমের আহমেদের ওপর ঝড় বইয়ে দেন তানজিদ। তৃতীয় বলে প্রথম ছক্কার পর শেষ দুই বলে মারেন আরও দুটি।
এক ওভার পর মেহেদী হাসান মিরাজের প্রথম বল ছক্কায় ওড়ান লিটন কুমার দাস। এক বল পর মারেন বাউন্ডারি। পরের বল আবারও বড় শটের খোঁজে ক্যাচ আউট হয়ে যান লিটন।
তবে থামেননি তানজিদ। মুশফিক হাসানের পরপর দুই বলে আরও দুটি ছক্কা মারেন বাঁহাতি ওপেনার। মাত্র ৪ ওভারে ৪৪ রান করে ফেলে ঢাকা।
মিরাজের পরপর দুই ওভারে আরও একটি করে বল সীমানার ওপারে পাঠান তানজিদ। মাত্র ১৮ বলে ৪৫ রানে পৌঁছে যান তিনি।
এরপর বিস্ময়কর ব্যাটিং
পাঁচ ওভারে পঞ্চাশ করে ফেলা ঢাকা এরপর হুট করেই ঢুকে যায় খোলসে। চার নম্বরে নেমে ফারমানউল্লাহ শাফি যেন ভুলেই যান রান করার দায়িত্বও আছে তার। শুরু থেকে ঝড় তোলা তানজিদকেও আঁকড়ে ধরে জড়তা।
১৮ বলে ৪৫ থেকে ফিফটি ছুঁতে আরও ১০ বল লেগে যায় বাঁহাতি ওপেনারের। পরে ব্যাটের কানায় লেগে একটি বাউন্ডারি পান তিনি। উইলিয়াম বসিস্টোর লাফিয়ে ওঠা ডেলিভারিতে পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে ড্রেসিং রুমে ফেরেন তানজিদ।
সব মিলিয়ে ১ চারের সঙ্গে ৭ ছক্কায় ৩৭ বলে তানজিদ করেন ৫৮ রান। আসরে তার ছক্কা হলো মোট ৩৬টি। ৪ ফিফটির সঙ্গে ১ সেঞ্চুরিতে ৪৮৫ রান করে তিনিই এখন পর্যন্ত ব্যাটসম্যানদের তালিকায় সবার ওপরে।
বসিস্টোর ওই ওভারে তানজিদের আগে ড্রেসিং রুমে ফেরেন শাফি। ২০ বলে তিনি বাউন্ডারি মারতে পারেননি একটিও, করতে পারেন মাত্র ৭ রান।
এরপর রানের খাতা খুলতে পারেননি থিসারা পেরেরা, বিপিএল অভিষিক্ত রহমতউল্লাহ আলি। রিয়াজ হাসান ৫ রান করতে খেলেন ১০ বল।
শেষে সাব্বিরের চেষ্টা
একশর আগে ৭ উইকেট হারানো দলকে কিছুটা আশা দেখান সাব্বির রহমান। প্রথম ৫ ওভারে ৫৩ রান করা দলটি পরবর্তী ১৩ ওভারে নিতে পারে মাত্র ৫০ রান। সাব্বিরের চেষ্টায় শেষ দুই ওভারে ২০ রান নিলেও তা লড়াইয়ের জন্য যথেষ্ট হয়নি।
অষ্টম উইকেটে মেহেদি হাসানের সঙ্গে ১৫ বলে তিনি যোগ করেন ২৬ রান। উনবিংশ ওভারে মুশফিকের বলে চারের পর ছক্কা মারেন সাব্বির।
ওই ওভারেই ফেরেন সাব্বির (১৭ বলে ২০)। এছাড়া মেহেদির ব্যাট থেকেও আসে একটি করে চার-ছক্কা।
হাসান-বসিস্টোর কৃপণ বোলিং
তানজিদের ঝড়ের সামনেও পাওয়ার প্লেতে দুই ওভার বোলিং করে মাত্র ১ রান দিয়েছিলেন হাসান। সব মিলিয়ে ৪ ওভারে এক মেডেনসহ তার খরচ ৫ রান, উইকেট নেন ২টি।
বিপিএলে পুরো ৪ ওভার বোলিং করে এটিই সবচেয়ে কম রান দেওয়ার রেকর্ড। ২০১৫ সালে শাহিদ আফ্রিদি ও ২০১৯ সালে নাহিদুল ইসলামও ৪ ওভারে দিয়েছিলেন ৫ রান করে।
হাসান ছাড়াও কৃপণ বোলিংয়ের প্রদর্শনী করেন খুলনার অনিয়মিত অফ স্পিনার বসিস্টো। ৪ ওভারে মাত্র ১০ রান খরচে ২ উইকেট নেন তিনি।
সব মিলিয়ে খুলনার হয়ে বোলিং করা সাত বোলারের সবাই অন্তত ১টি করে উইকেট নেন। এ নিয়ে বিপিএলে পাঁচবার এক ইনিংসে সাত বোলার পেলেন উইকেটের স্বাদ।
শুরুতে চাপে খুলনা
ছোট লক্ষ্যে প্রথম ওভারেই মোহাম্মদ নাঈম শেখের উইকেট হারায় খুলনা। মুস্তাফিজুর রহমানের বলে ক্যাচ দেন আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি করা বাঁহাতি ওপেনার।
মুস্তাফিজের পরের ওভারে ব্যাটের সামনের কানায় লেগে পয়েন্টে ধরা পড়েন আফিফ হোসেন। শুরুতেই দুই উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যায় খুলনা।
মিরাজের পাল্টা আক্রমণ
নন স্ট্রাইকে দাঁড়িয়ে নাঈম-আফিফকে ফিরতে দেখে ভড়কে যাননি মিরাজ। তার কাজ সহজ করে দেন মেহেদি হাসান, ফারমানউল্লাহ শাফিরা। পঞ্চম ওভারে মেহেদির বলে ছক্কা মারেন মিরাজ। পরে অ্যালেক্স রসের ব্যাট থেকে আসে চার।
পাওয়ার প্লের শেষ ওভারে এলোমেলো বোলিং করেন শাফি। বুক উচ্চতার প্রথম ডেলিভারিতে বাউন্ডারি মারেন মিরাজ। পরে ফ্রি হিট বল ছক্কায় ওড়ান খুলনা অধিনায়ক। ওভারের পঞ্চম বলে কাভার দিয়ে চার মারেন রস।
প্রথম ৪ ওভারে মাত্র ১৯ রান করা খুলনা পরের দুই ওভারে পেয়ে যায় ৩৪ রান।
শাফির পরের ওভারে পয়েন্ট দিয়ে আরেকটি ছক্কা মারেন মিরাজ। মাত্র ৩৩ বলে পূর্ণ হয় তার ফিফটি।
দশম ওভারে রহমতউল্লার বলে ছক্কা মারতে গিয়ে ডিপ মিড উইকেটে ক্যাচ দেন রস (১৯ বলে ২২)। তার বিদায়ে ভাঙে ৪৩ বলে ৬৮ রানের জুটি।
মিরাজের ব্যাটেই জয়
রস ফিরে গেলেও অন্য প্রান্তে অবিচল থাকেন মিরাজ। তাকে সঙ্গ দেন বসিস্টো। দুজন মিলে গড়েন ৩৭ বলে ৩৮ রানের জুটি। জয়ের খুব কাছে গিয়ে ড্রেসিং রুমের পথ ধরেন বসিস্টো।
পরে আবু জায়েদ চৌধুরির বলে ছক্কা মেরে ম্যাচ শেষ করেন মোহাম্মদ নাওয়াজ। ৫ চারের সঙ্গে ৪ ছক্কায় ৫৫ বলে ৭৪ রানে অপরাজিত থাকেন মিরাজ।
মুস্তাফিজের ৩ উইকেট
ঢাকার হয়ে একাই কিছুটা চেষ্টা করেন মুস্তাফিজ। ৪ ওভারে মাত্র ১৬ রানে তিনি নেন ৩ উইকেট। চলতি আসরে এবারই প্রথম কোনো ম্যাচে ২ উইকেটের বেশি পেলেন বাঁহাতি পেসার। সব মিলিয়ে ১২ ম্যাচে তার শিকার ১৩ উইকেট।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
ঢাকা ক্যাপিটালস: ২০ ওভারে ১২৩/৯ (তানজিদ ৫৮, লিটন ১০, হাবিবুর ৩, শাফি ৭, সাব্বির ২০, পেরেরা ০, রিয়াজ ৫, রহমতউল্লাহ ০, মেহেদি ১৩, আবু জায়েদ ১*, মুস্তাফিজ ১*; নাসুম ২-০-২০-১, হাসান ৪-১-৫-২, মিরাজ ৪-০-৩০-১, মুশফিক ২-০-৩১-১, বসিস্টো ৪-০-১০-২, জিয়াউর ২-০-১০-১, নাওয়াজ ২-০-১৫-১)
খুলনা টাইগার্স: ১৬.৫ ওভারে ১২৮/৪ (মিরাজ ৭৪*, নাঈম ০, আফিফ ০, রস ২২, বসিস্টো ১৮, নাওয়াজ ৬*; মুস্তাফিজ ৪-০-১৬-৩, আবু জায়েদ ২.৫-০-১৮-০, রহমতউল্লাহ ৪-০-২৪-১, মেহেদি ২-০-২১-০, শাফি ৪-০-৪৭-০)
ফল: খুলনা টাইগার্স ৬ উইকেটে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: মেহেদী হাসান মিরাজ